৮ বছর আলাদা থাকলে ভাঙবে বিয়ে: 'শুধু কাগজে-কলমে থাকা সম্পর্ক' বাতিলের ঐতিহাসিক রায়
৮ বছর আলাদা থাকলে 'কাগজে-কলমে থাকা বিয়ে' বাতিলের সুপ্রিম রায়
দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নি ও তিক্ততায় ভরা বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কেবল স্বামী-স্ত্রীর জন্যই নয়, সমাজের জন্যও ইতিবাচক নয়—এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে, স্বামী-স্ত্রী যদি দীর্ঘদিন (যেমন ৮ বছর বা তার বেশি সময়) ধরে সম্পূর্ণ আলাদা বসবাস করেন এবং তাদের মধ্যে পুনরায় একত্রে থাকার কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট না থাকে, তবে সেই বিয়েকে 'অপ্রত্যাবর্তনযোগ্যভাবে ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক' বা 'Irretrievable Breakdown of Marriage' হিসেবে গণ্য করা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে এক পক্ষ বিচ্ছেদে অসম্মত থাকলেও বা মামলার জটিলতা থাকলেও, শুধুমাত্র 'কাগজে-কলমে' টিকে থাকা এই মৃতপ্রায় সম্পর্ক বাতিল করে সরাসরি ডিভোর্সের ডিগ্রি মঞ্জুর করার আইনি পথ সুগম হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মূল নিয়ম ও গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ:
- সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতা: ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪২ (Article 142)-এর অধীনে অর্পিত বিশেষ ক্ষমতার বলে সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি এমন বিবাহ ভেঙে দেওয়ার রায় দিতে পারেন, যেখানে পারিবারিক আইন অনুযায়ী সাধারণ আদালতের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে।
- সম্মতি না থাকলেও বিচ্ছেদ: যদি স্বামী বা স্ত্রীর একজন বিচ্ছেদে রাজি না-ও হন, কিন্তু আদালত যদি নিশ্চিত হন যে সম্পর্কটি কেবল কাগজে-কলমে বেঁচে আছে এবং বাস্তবে পুনরুদ্ধারের কোনো পথ নেই, তবে অপর পক্ষের আবেদন বিবেচনা করে ডিভোর্স মঞ্জুর করা যেতে পারে।
- দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মেয়াদ: সাধারণত ৮ বছর বা তার বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা, কোনো যোগাযোগ না থাকা এবং একাধিক আইনি বিবাদ অমীমাংসিত থাকা এই ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
- ক্রুয়েলটি বা মানসিক নিষ্ঠুরতা: দীর্ঘ সময় ধরে কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া সঙ্গীকে বৈবাহিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আলাদা রাখাকে আদালত মানসিক নির্যাতন বা 'Cruelty' হিসেবে গণ্য করতে পারেন।
- আর্থিক ও খোরপোশের নিরাপত্তা: বিয়ে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাথে সাথে স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা (Permanent Alimony) এবং খোরপোশ সুনিশ্চিত করার পরই আদালত এই বিশেষ ডিক্রি প্রদান করেন।
পারিবারিক বিবাদে নতুন দিগন্ত ও আইনি প্রভাব
সাধারণত প্রচলিত হিন্দু বিবাহ আইনে 'অপ্রত্যাবর্তনযোগ্যভাবে ভেঙে যাওয়া বিয়ে' (Irretrievable Breakdown) সরাসরি কোনো আইনি গ্রাউন্ড বা ভিত্তি হিসেবে লিখিত নেই। ফলে নিছক ক্ষোভ বা জেদের বশে অনেক সময় এক পক্ষ ডিভোর্স আটকে রেখে বছরের পর বছর মামলা টেনে নিয়ে যেতেন। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে দীর্ঘমেয়াদী আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই বিশেষ অধিকার কেবল তখনই প্রয়োগ করা হবে যখন সব ধরণের মধ্যস্থতা (Mediation) ও সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে বা সামান্য মনোমালিন্যের কারণে আলাদা থাকলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। সংক্ষেপে, যে সম্পর্কের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই, তাকে আদালতের মাধ্যমে আইনি মুক্তি দিয়ে উভয় পক্ষকে নতুন করে জীবন শুরু করার অধিকার দেয়াই এই ঐতিহাসিক রায়ের মূল লক্ষ্য।