ইউরিক অ্যাসিড কমানোর ঘরোয়া উপায় এবং যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
ইউরিক অ্যাসিড কমানোর ঘরোয়া উপায় এবং যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জয়েন্টে ইউরিক অ্যাসিডের ক্রিস্টাল জমে গাউট বা তীব্র জয়েন্টের ব্যথা তৈরি হতে পারে। তবে শুধু ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি থাকলেই সবার গাউট হয় না। খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ওজন, কিডনির কার্যকারিতা, কিছু ওষুধ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণ ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইউরিক অ্যাসিড কমানোর জন্য কোনও একক ঘরোয়া উপায় নেই। তবে পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং পিউরিনসমৃদ্ধ ও অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবার কমানোর মতো অভ্যাস উপকারী হতে পারে।
ইউরিক অ্যাসিড কমাতে ১০টি সহজ অভ্যাস
১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
পর্যাপ্ত পানি পান শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে ইউরিক অ্যাসিড বের হতে সহায়তা করতে পারে। সারাদিনে নিয়মিত পানি পান করুন। তবে কিডনি বা হৃদ্যন্ত্রের রোগ থাকলে কতটা তরল প্রয়োজন তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করুন।
২. স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
অতিরিক্ত ওজন ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ওজন বেশি হলে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানোর চেষ্টা করুন। খুব দ্রুত ওজন কমানো বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
৩. উচ্চ পিউরিনযুক্ত খাবার কমান
পিউরিন ভেঙে শরীরে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয়। তাই যাঁদের গাউট বা উচ্চ ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের অতিরিক্ত পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার সীমিত করা উপকারী হতে পারে।
৪. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাংস এড়িয়ে চলুন
কলিজা, কিডনি, মস্তিষ্ক ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাংসে পিউরিনের পরিমাণ বেশি থাকে। ইউরিক অ্যাসিড বা গাউটের সমস্যা থাকলে এসব খাবার এড়িয়ে চলা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কঠোরভাবে সীমিত করা ভালো।
৫. কিছু সামুদ্রিক খাবার সীমিত করুন
সার্ডিন, অ্যাঙ্কোভি, ম্যাকারেল, কিছু শেলফিশসহ নির্দিষ্ট সামুদ্রিক খাবারে পিউরিন বেশি থাকতে পারে। এগুলো অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে চলুন এবং আপনার ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী সাজান।
৬. লাল মাংসের পরিমাণ কমান
গরু, খাসি বা অন্যান্য লাল মাংস বেশি খেলে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়তে পারে। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন এবং খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও উপযুক্ত অন্যান্য প্রোটিনের উৎস রাখুন।
৭. অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
বিশেষ করে বিয়ার ও কিছু ধরনের অ্যালকোহল ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বাড়াতে এবং গাউটের আক্রমণকে উসকে দিতে পারে। গাউট থাকলে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা সবচেয়ে নিরাপদ।
৮. চিনি ও মিষ্টি পানীয় কমান
ফ্রুক্টোজযুক্ত কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া জুস, মিষ্টি পানীয় ও অন্যান্য উচ্চ-চিনিযুক্ত খাবার ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এসব খাবার ও পানীয় কমিয়ে পানি বা চিনি ছাড়া পানীয় বেছে নিন।
৯. নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ করুন
নিয়মিত হাঁটা ও মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে গাউটের তীব্র আক্রমণের সময় আক্রান্ত জয়েন্টে অতিরিক্ত চাপ না দেওয়াই ভালো।
১০. চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত নিন
বারবার গাউটের আক্রমণ হলে শুধু খাবার নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নাও হতে পারে। চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিক অ্যাসিড কমানোর ওষুধ দিতে পারেন। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ বা শুরু না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
ইউরিক অ্যাসিড বেশি হলে যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
- কলিজা, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাংস
- অতিরিক্ত লাল মাংস
- সার্ডিন, অ্যাঙ্কোভি ও কিছু উচ্চ-পিউরিন সামুদ্রিক খাবার
- বিয়ার ও অন্যান্য অ্যালকোহল
- অতিরিক্ত চিনি দেওয়া কোমল পানীয়
- ফ্রুক্টোজযুক্ত মিষ্টি পানীয়
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ-ক্যালরির খাবার
কোন খাবারগুলো তুলনামূলক ভালো?
গাউট বা উচ্চ ইউরিক অ্যাসিডের ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকায় শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, স্বাস্থ্যকর বিকল্প রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে সবজি, সম্পূর্ণ ফল, পূর্ণ শস্য, কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার এবং উপযুক্ত পরিমাণে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
- বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি
- সম্পূর্ণ ফল, পরিমিত পরিমাণে
- ওটস ও পূর্ণ শস্য
- কম চর্বিযুক্ত দুধ বা দই
- ডাল ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, ব্যক্তিগত সহনশীলতা অনুযায়ী
- বাদাম ও বীজ, পরিমিত পরিমাণে
- পর্যাপ্ত পানি
ডাল ও সবজি কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
উচ্চ পিউরিনযুক্ত উদ্ভিজ্জ খাবার যেমন কিছু ডাল ও নির্দিষ্ট সবজিতে পিউরিন থাকলেও এগুলো সাধারণত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাংস বা কিছু সামুদ্রিক খাবারের মতো গাউটের ঝুঁকি বাড়ায় না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সব ডাল ও সবজি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত নয়।
লেবু পানি বা ঘরোয়া পানীয় কি ইউরিক অ্যাসিড গলিয়ে দেয়?
লেবু পানি বা কোনও নির্দিষ্ট ঘরোয়া পানীয় ইউরিক অ্যাসিডের ক্রিস্টাল গলিয়ে দেয় বা গাউটের নিশ্চিত চিকিৎসা করে—এমন প্রমাণ নেই। তবে চিনি ছাড়া লেবু পানি পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের একটি উপায় হতে পারে। মূল বিষয় হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।
গাউটের ব্যথা হলে কী করবেন?
তীব্র গাউটের আক্রমণে আক্রান্ত জয়েন্টে ব্যথা, ফোলা, লালভাব ও গরম অনুভূত হতে পারে। আক্রান্ত জয়েন্টকে বিশ্রাম দেওয়া এবং অতিরিক্ত চাপ এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে। তবে তীব্র ব্যথার সঠিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
প্রথমবার হঠাৎ তীব্র জয়েন্টের ব্যথা ও ফোলা হলে, বারবার গাউটের আক্রমণ হলে বা ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা দীর্ঘদিন বেশি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জ্বরের সঙ্গে জয়েন্ট লাল ও ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি, কারণ সংক্রমণসহ অন্যান্য গুরুতর সমস্যার সঙ্গেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
শেষ কথা
ইউরিক অ্যাসিড কমানোর জন্য শুধু একটি খাবার বাদ দিলেই হবে না; পুরো জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার দিকে নজর দিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, অ্যালকোহল ও অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয় এড়িয়ে চলা এবং উচ্চ পিউরিনযুক্ত খাবার সীমিত করা সহায়ক হতে পারে। বারবার গাউটের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইউরিক অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।