হিমোগ্লোবিন বা রক্তে রক্তকণিকা বাড়ানোর সেরা ১০টি পুষ্টিকর খাবার

হিমোগ্লোবিন বা রক্তে রক্তকণিকা বাড়ানোর সেরা ১০টি পুষ্টিকর খাবার

হিমোগ্লোবিন বা রক্তে রক্তকণিকা বাড়ানোর সেরা ১০টি পুষ্টিকর খাবার

হিমোগ্লোবিন লোহিত রক্তকণিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে। রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলেট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি রক্তশূন্যতার অন্যতম কারণ হতে পারে।

তবে হিমোগ্লোবিন কম থাকার কারণ সবসময় শুধু আয়রনের ঘাটতি নয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, দীর্ঘস্থায়ী রোগ, ভিটামিনের ঘাটতি বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণেও অ্যানিমিয়া হতে পারে। তাই রক্ত পরীক্ষায় হিমোগ্লোবিন কম পাওয়া গেলে কারণ নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ।

হিমোগ্লোবিন বাড়াতে সহায়ক ১০টি পুষ্টিকর খাবার

১. পালং শাক ও সবুজ শাকসবজি

পালং শাকসহ বিভিন্ন গাঢ় সবুজ শাকসবজিতে আয়রন ও ফোলেটসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। নিয়মিত সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে এসব শাক খাওয়া যেতে পারে।

২. ডাল

মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবারে আয়রন, ফোলেট, প্রোটিন ও আঁশ থাকে। নিরামিষভোজীদের জন্য এগুলো আয়রনের গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস হতে পারে।

৩. ডিম

ডিমে প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি১২, আয়রনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। একটি সুষম খাদ্যতালিকায় পরিমিত ডিম রাখা যেতে পারে।

৪. মাছ

মাছ প্রোটিনের ভালো উৎস এবং কিছু মাছ থেকে ভিটামিন বি১২ ও আয়রন পাওয়া যায়। খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের মাছ পরিমিত পরিমাণে রাখা যেতে পারে।

৫. মাংস

মাংস, বিশেষ করে গরু বা অন্যান্য প্রাণিজ মাংসে শরীর সহজে শোষণ করতে পারে এমন ধরনের আয়রন থাকে। তবে অতিরিক্ত লাল মাংস না খেয়ে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে খাওয়া ভালো।

৬. কলিজা

কলিজায় আয়রন, ভিটামিন বি১২ ও ফোলেটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে। তবে এতে ভিটামিন এ-ও অনেক বেশি থাকে। তাই নিয়মিত বা অতিরিক্ত কলিজা খাওয়ার বদলে পরিমাণ ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কলিজা এড়িয়ে চলার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৭. কিশমিশ ও শুকনো ফল

কিশমিশ, শুকনো এপ্রিকটসহ কিছু শুকনো ফলে আয়রন থাকতে পারে। তবে শুকনো ফলে প্রাকৃতিক চিনি ও ক্যালরি তুলনামূলক বেশি হওয়ায় পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

৮. বাদাম ও বীজ

কুমড়ার বীজ, তিল, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন বাদাম ও বীজে আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। এগুলো পরিমিত পরিমাণে খাবারের সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে।

৯. বিটরুট

বিটরুটে ফোলেটসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে এবং এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে শুধু বিটরুট খেলেই হিমোগ্লোবিন দ্রুত বেড়ে যায়—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। রক্তশূন্যতা থাকলে আয়রন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির পর্যাপ্ত উৎস নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১০. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল

কমলালেবু, পেয়ারা, আমলকি, লেবু, কিউইসহ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার সরাসরি হিমোগ্লোবিন তৈরি করে না, তবে উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে পাওয়া আয়রন শরীরে শোষণে সাহায্য করতে পারে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল বা সবজি রাখা উপকারী।

আয়রন শোষণ বাড়ানোর সহজ উপায়

খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি যুক্ত করলে উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শোষণ বাড়তে পারে। যেমন ডাল বা শাকের সঙ্গে লেবু, পেয়ারা বা অন্য কোনও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন।

অন্যদিকে খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত চা বা কফি পান করলে আয়রন শোষণ কমতে পারে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের কাছাকাছি সময়ে চা-কফি না খাওয়াই ভালো।

হিমোগ্লোবিন কম হলে কী খাবেন?

  • ডাল ও ছোলা
  • সবুজ শাকসবজি
  • ডিম
  • মাছ ও প্রয়োজন অনুযায়ী মাংস
  • পরিমিত বাদাম ও বীজ
  • আয়রনসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার
  • ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি

হিমোগ্লোবিন বাড়াতে শুধু খাবারই কি যথেষ্ট?

সবসময় নয়। আয়রনের ঘাটতিজনিত অ্যানিমিয়া হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন। আবার ভিটামিন বি১২ বা ফোলেটের ঘাটতি, অতিরিক্ত মাসিক রক্তক্ষরণ, অন্ত্র বা কিডনির সমস্যা কিংবা অন্য কোনও রোগের কারণে অ্যানিমিয়া হলে সেই কারণের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

নিজে থেকে দীর্ঘদিন আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত আয়রন শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার ফল ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা নিরাপদ।

হিমোগ্লোবিন কম থাকার সম্ভাব্য লক্ষণ

  • অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা
  • মাথা ঘোরা
  • ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  • অল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট
  • হৃদস্পন্দন দ্রুত অনুভূত হওয়া
  • মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?

অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, অস্বাভাবিক রক্তপাত, কালো পায়খানা বা দ্রুত হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। হিমোগ্লোবিন কম থাকলে কারণ জানার জন্য চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী CBC, আয়রন, ফেরিটিন, ভিটামিন বি১২, ফোলেট বা অন্যান্য পরীক্ষা করতে পারেন।

শেষ কথা

হিমোগ্লোবিন ভালো রাখতে আয়রন, ভিটামিন বি১২, ফোলেট, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টির সুষম গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। ডাল, শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস, বাদাম ও বীজের মতো খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি যুক্ত খাবার খেলে আয়রন শোষণে সাহায্য হতে পারে। তবে হিমোগ্লোবিন কম থাকলে শুধু খাবারের ওপর নির্ভর না করে মূল কারণ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।