মোহরানা ও ডিভোর্স: বিবাহবিচ্ছেদের পর দেনমোহর পরিশোধ নিয়ে মুসলিম আইনের নিয়ম
মুসলিম আইনে দেনমোহর বা মোহরানা কী?
ইসলামিক আইন ও ভারতের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law) অনুযায়ী, দেনমোহর বা মোহরানা হলো বিবাহের সময় স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে প্রদান করা একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক উপহার বা সম্পত্তি। দেনমোহর কোনো দান বা খোরপোশ নয়, বরং এটি স্ত্রীর একটি সুনির্দিষ্ট এবং অলঙ্ঘনীয় আইনি ও ধর্মীয় অধিকার। বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের ক্ষেত্রে দেনমোহর পরিশোধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিবাহের চুক্তিপত্র বা নিকাহনামায় দেনমোহরের পরিমাণ স্পষ্ট করে উল্লেখ থাকে। ডিভোর্স যেভাবেই হোক না কেন, স্ত্রীর এই প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের বিষয়ে মুসলিম আইনে সুস্পষ্ট ও কঠোর নিয়মাবলী রয়েছে।
দেনমোহরের ধরণ ও পরিশোধের সময়সীমা:
- মোয়াজ্জল (Mu'ajjal) বা তাৎক্ষণিক দেনমোহর: এটি হলো সেই দেনমোহর যা বিবাহের পরপরই বা স্ত্রীর দাবি করা মাত্র স্বামীকে পরিশোধ করতে হয়। ডিভোর্সের সময় পর্যন্ত এটি বকেয়া থাকলে তা অবিলম্বে মেটাতে হয়।
- মুঅজ্জল (Mu'ajjal) বা বিলম্বিত দেনমোহর: এই দেনমোহরটি সাধারণত বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে অথবা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে পরিশোধ করার চুক্তি থাকে। ডিভোর্স হওয়ার সাথে সাথেই এটি প্রদান করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।
- ডিভোর্সের প্রকারভেদ অনুযায়ী দেনমোহর: স্বামী তালাক দিলে স্ত্রীকে সম্পূর্ণ দেনমোহর শোধ করতে হয়। কিন্তু স্ত্রী যদি 'খোলা' (Khula)-র মাধ্যমে নিজে বিচ্ছেদ চান, তবে সাধারণত সমঝোতার ভিত্তিতে স্ত্রী দেনমোহর মওকুফ করতে পারেন বা ফেরত দিতে সম্মত হন।
- সহবাসের ওপর ভিত্তি: বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর এবং দাম্পত্য সহবাস (Consummation) ঘটার পর ডিভোর্স হলে স্ত্রী সম্পূর্ণ দেনমোহর পাওয়ার অধিকারী হন। তবে সহবাসের পূর্বে বিচ্ছেদ হলে স্ত্রী নির্ধারিত দেনমোহরের অর্ধেক পাওয়ার বিধান রয়েছে।
ডিভোর্সের পর দেনমোহর এবং খোরপোশের আইনি অবস্থান
অনেকের মনে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে দেনমোহর পরিশোধ করে দিলেই ডিভোর্সের পর আর খোরপোশ দিতে হয় না। তবে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিষয়টি ভিন্ন। ১৯৮৫ সালের ঐতিহাসিক 'শাহ বানু বেগম' মামলা এবং পরবর্তীতে মুসলিম নারী (বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার সুরক্ষা) আইন ১৯৮৬ (Muslim Women Protection of Rights on Divorce Act, 1986) অনুযায়ী, দেনমোহর পাওয়ার পাশাপাশি একজন তালাকপ্রাপ্তা মুসলিম নারী ইদ্দত (Iddat) চলাকালীন সময়ে প্রাক্তন স্বামীর কাছ থেকে খোরপোশ পাওয়ার অধিকারী।
এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায় (যেমন—দানিয়াল লতিফি মামলা) অনুযায়ী, তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী পুনরায় বিবাহ না করা পর্যন্ত তার ভবিষ্যৎ জীবনধারণের জন্য স্বামী ইদ্দতকালের মধ্যেই একটি যুক্তিসঙ্গত ও পর্যাপ্ত এককালীন অর্থ (Reasonable and Fair Provision) প্রদান করতে বাধ্য থাকবেন। অর্থাৎ, দেনমোহর হলো স্ত্রীর পূর্বে নির্ধারিত নিজস্ব অধিকার, যা প্রদান করা সত্ত্বেও আদালতের মাধ্যমে জীবনধারণের খোরপোশ পাওয়ার সুযোগ সংরক্ষিত থাকে।