অনন্ত মহারাজের ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রত্যাহার: নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত

অনন্ত মহারাজের ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রত্যাহার: নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত

নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কের জেরে অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহার

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ নগেন্দ্রনাথ রায়, যিনি অনন্ত মহারাজ নামেও পরিচিত, তাঁর ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মান হারালেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৩ আগস্ট সরকারি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মানগুলির অন্যতম এই পুরস্কার প্রত্যাহার ও বাতিল করার কথা জানায়। সরকারি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনার পর তাঁর এই সম্মান ধরে রাখা পুরস্কারের মর্যাদা, সম্মান ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

গত ১৯ জুলাই দিনহাটার একটি অনুষ্ঠানে অনন্ত মহারাজ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে। তিনি নেতাজিকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর ওই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর রাজ্যের বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। একাধিক জায়গায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের হয়।

কী মন্তব্য করেছিলেন অনন্ত মহারাজ?

বিতর্কের সূত্রপাত হয় দিনহাটার ওই সভায় তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনন্ত মহারাজ দাবি করেন যে নেতাজি নিজের ক্ষমতায় আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেননি। জার্মানির হাতে বন্দি ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদের নিয়ে গঠিত বাহিনীকে নেতাজি ব্যবহার করেছিলেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতাজির অবদান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: এই মন্তব্যের পর রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। নেতাজি সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ দায়ের হওয়ার পাশাপাশি রাজ্য সরকারের তরফেও কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

  • ১৩ আগস্ট অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করা হয়
  • নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া
  • আজাদ হিন্দ ফৌজ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি
  • চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল
  • সরকারি সিদ্ধান্তে সম্মানটি বাতিল করার কথা জানানো হয়েছে

মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সম্মান প্রত্যাহার

নগেন্দ্রনাথ রায় ওরফে অনন্ত মহারাজকে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বঙ্গবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। রাজ্যের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায় ছয় মাসের মধ্যেই সেই সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার।

সরকারের বিজ্ঞপ্তিতে মূলত সম্মানের মর্যাদা ও উদ্দেশ্যের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গিয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়া

অনন্ত মহারাজের মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করা হয়েছে। বিজেপির কয়েকজন নেতা তাঁর মন্তব্যের সঙ্গে একমত নন বলেও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। অন্যদিকে শাসক ও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

তবে ঘটনার পর অনন্ত মহারাজ তাঁর মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, তাঁর বক্তব্য পুরোনো নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে করা। পরবর্তীতে বিতর্ক আরও বাড়ার পর তিনি একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, তাঁর বক্তব্যে কারও মনে আঘাত লেগে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। একই সঙ্গে নেতাজির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার কথাও জানান তিনি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বাঙালি তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁকে এবং তাঁর ভূমিকা নিয়ে মন্তব্যের জেরে কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তির রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রত্যাহারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব বহন করছে। অনন্ত মহারাজের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত সেই কারণেই বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগের পর অনন্ত মহারাজের বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠেছে। সরকারি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এই মন্তব্য, তার ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার দিকেও নজর থাকবে।