জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ, পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ
জয়ন্তী থেকে জঙ্গল সাফারি বন্ধের সিদ্ধান্ত
বর্ষার দীর্ঘ বন্ধের পর বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প পর্যটকদের জন্য খুলতে চলেছে। কিন্তু তার আগেই জয়ন্তী থেকে জঙ্গল সাফারি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে আলিপুরদুয়ারের পর্যটন ব্যবসায়ী মহলে। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী দিনে বক্সায় পর্যটকদের জন্য জঙ্গল সাফারি শুধুমাত্র রাজাভাতখাওয়া থেকেই চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। যদিও এখনও এ বিষয়ে সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়নি, সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গিয়েছে।
প্রতি বছর বর্ষার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাজ্যের বিভিন্ন বনাঞ্চলে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকে। চলতি বছরও বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে সেই নিয়ম কার্যকর রয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে বক্সা-সহ রাজ্যের একাধিক বনাঞ্চল পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়ার কথা। সেই সময় জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধ হয়ে গেলে পর্যটকদের জন্য মূলত রাজাভাতখাওয়াই বক্সার জঙ্গল সাফারির প্রবেশপথ হিসেবে থাকবে।
জয়ন্তী থেকে ১৪টি গাড়ি চলত
বর্তমানে বক্সা এলাকায় দুটি জায়গা থেকে জঙ্গল সাফারি পরিচালিত হয়—জয়ন্তী এবং রাজাভাতখাওয়া। জয়ন্তী থেকে ১৪টি গাড়ি এবং রাজাভাতখাওয়া থেকে পাঁচটি গাড়ি পর্যটকদের নিয়ে জঙ্গলে যায়। দুই জায়গার সাফারি রুটের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। ফলে জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধ হলে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষ সরাসরি প্রভাবিত হতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, জয়ন্তীকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত গাড়িচালক, হোটেল ও হোমস্টে মালিক, খাবারের দোকান, স্থানীয় গাইড এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসায়ী এই পর্যটন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। তাই সাফারি বন্ধ হলে শুধু সাফারি গাড়ির মালিকরাই নন, বৃহত্তর পর্যটন ব্যবসাও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
আলিপুরদুয়ার জেলা ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশের আগেই জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধের সিদ্ধান্তের খবর সামনে এসেছে। তাঁদের মতে, পর্যটন মরশুম শুরুর আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। কারণ, পর্যটকরা কোথা থেকে সাফারি করতে পারবেন সে বিষয়ে সঠিক তথ্য না থাকলে হোটেল, গাড়ি ও পর্যটন পরিষেবার বুকিং নিয়েও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের আরও বক্তব্য, জয়ন্তী আলিপুরদুয়ারের অন্যতম পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র। বক্সার জঙ্গল ঘুরতে আসা বহু পর্যটক জয়ন্তীকে তাঁদের ভ্রমণ পরিকল্পনার অংশ করেন। ফলে সেখান থেকে সাফারি বন্ধ হয়ে গেলে পর্যটকদের একটা অংশ অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে।
বক্সার জঙ্গলে বাঘ আনার প্রস্তুতি
জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধের সিদ্ধান্তের সময়েই বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে নতুন করে বাঘ আনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, বিহারের বাল্মীকি ব্যাঘ্র প্রকল্পে কয়েকটি বাঘিনির উপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার বিশেষজ্ঞরা তাদের গতিবিধি ও স্বভাব পর্যবেক্ষণ করছেন। উপযুক্ত একটি বাঘিনি চিহ্নিত হওয়ার পর তাকে বক্সায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
বাঘের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধের সিদ্ধান্তের কোনও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বন দফতরের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। ফলে সিদ্ধান্তের প্রকৃত কারণ নিয়ে পর্যটন মহলে আলোচনা চলছে।
নতুন পর্যটন মরশুমের আগে উদ্বেগ
বর্ষার তিন মাসের বন্ধের পর বনাঞ্চল খুললে সাধারণত উত্তরবঙ্গের পর্যটন ব্যবসায় নতুন করে গতি আসে। সেই সময় জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধ হয়ে গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা সাফারি-নির্ভর পর্যটনের উপর সরাসরি নির্ভরশীল, তাঁদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এখন পর্যটন ব্যবসায়ীদের নজর বন দফতরের সরকারি নির্দেশিকার দিকে। জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে পর্যটকদের জন্য নতুন ব্যবস্থা কী হবে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা হবে এবং সাফারি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত গাড়িগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে—এই প্রশ্নগুলির উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের পর্যটন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের পাশাপাশি বাঘ সংরক্ষণ ও স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জয়ন্তীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কতটা দূর করা যায়, সেটাই আগামী দিনে দেখার বিষয়।